এই সুরার গুরুত্ব ও তাৎপর্য
হযরত
আবুদ্দারদা রা থেকে বর্ণিত আছে যে, যে ব্যক্তি সুরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত
মুখস্থ করে সে দাজ্জালের ফেৎনা থেকে নিরাপদ থাকবে। হযরত আবুদ্দারদা রা
থেকে আরও অন্য রেওয়াতে বর্ণিত এই বিষয়বস্ত সুরা কাহফের শেষ দশ আয়াত মুখস্ত
করা সম্পর্কে বর্নিত রয়েছে। (মুসলিম, আবু দাউদ,তিরমিযি, নাসায়ী ও মুসনাদে
আহমাদে )
মুসনাদে আহমদে হযরত সাহল ইবনে মু’আযের রেও্য়াতে
আছে, যে ব্যক্তি শুক্রবার দিন সূরা কাহফ এর প্রথম ও শেষ আয়াত গুলো পাঠ
করবে তার পা থেকে আকাশের উচ্চতা পর্যন্ত নূর হয়ে যাবে,এবং যে ব্যক্তি
সম্পুর্ন সুরা পাঠ করবে তার জন্য জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত নুর হয়ে
যায় । (মুসনাদে আহমাদে)
হাদীসে আরো বর্ণিত আছে, যে ব্যক্তি
শুক্রবার দিন সূরা কাহফ পাঠ করবে তার পা থেকে আকাশের উচ্চতা পর্যন্ত নূর
হয়ে যাবে, যা কেয়ামতের দিন আলো দিবে এবং বিগত জুমআ থেকে এ জুমআ পর্যন্ত
তার সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। যা কেয়ামতের দিন আলো দিবে এবং বিগত জুমআ থেকে
এ জুমআ পর্যন্ত তার সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।
নাযিলের সময় কালঃ
রাসুলে
পাক সাঃ এর মক্কা জীবনের ৫ম নববী সন থেকে ১০নববী সন পর্যন্ত সময়ের মধ্যে
এই সুরাটি নাযিল হয়।নবুয়তের প্রথম ৩বছর দাওয়াতি কাজ শুরু হয় গোপনে।নবুয়তের
ঘোষনার পরবর্তি দুই বছর বিরোধিতা শুরু হয়। তার রুপ ছিল ঠাট্টা,বিদ্রূপ,
গালিগালাজ, মিথ্যা প্রচারনা বা জোটবদ্ধ হয়ে নির্যাতন করত গরীব অসহায়
মুসলমানদের উপর। কিন্তু ৫ম নববী সন থেকে ১০নববী সন পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে
চরম উৎপীড়ন ও বিরোধিতা চরম আকার ধারন করে।এই সময় জুলুম, নিপীড়ন, মারধর,
অর্থনৈতিক চাপ, নবিজী ও ওনার পরিবার বর্গ সহ অনেক মুসলমানদের সামাজিক ও
অর্থনৈতিক ভাবে বয়কট করা হয় এবং আবু তালিব গিরি গুহায় অবরুদ্ধ রাখা হয় ।আরও
কষ্ট ভেড়ে যায় আবু তালিব ও উম্মুল মু’মিনিন বিবি খাদিজার ইন্তেকাল এই সময়ে
হওয়াতে অভিভাবকের ন্যায় দুই জন গুরুত্ব পুর্ণ ব্যক্তি হারান ।এই সময়
নবিজীর ও ওনার সাথীদের মক্কার জীবন এর সবচেয়ে বিপদ জনক সময় ছিল।
এই
সুরা নাজিলের সময় মক্কার কাফেরদের জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন, বিরোধীতা ও
প্রতিবন্ধকতা চরম পর্যায়ে পৌছে গিয়েছিল।মুসলমানদের এই কঠিন অবস্থায় যেন
ইমানের মজবুতি বেড়ে যায় মনোবল ভেেঙ্গ না যায় তাই তাদেরকে আল্লাহ শুনান যে
ইতিপুর্বে ইমানদারেরা ইমান বাছাবার জন্য কি করেছেন তা জানার জন্য আসহাবে
কাহাফের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে।
এই সুরার শিক্ষা ও বর্তমান প্রেক্ষাপটঃ
মক্কার
মুশরিকরা নবিজী সাঃ এর কাছে সত্যি কোন গায়েবি ইলেমের মাধ্যম আছে কিনা তা
জানার জন্য পরীক্ষা মুলক তিন্ টি প্রশ্ন নির্বাচন করে। প্রশ্ন গুলো ছিল
খৃস্টান ও ইয়াহুদী দের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত। তার জবাবে এই সুরাটি নাজিল
হয়। প্রশ্ন তিন্ টি ছিলঃ এক, আসহাবে কাহাফ কারা ছিলেন? দুই, খিযিরের
ঘটনাটি এবং তার তাৎপর্য কি? তিন, জুলকারনাইনের ঘটনাটি কি? আল্লাহ রাব্বুল
আলামিন এই প্রশ্ন গুলোর জবাবের মাধ্যমে সে সময় এর মক্কায় কুফর ও ইসলামের
মধ্যে যে অবস্থা বিরাজ করছিল তারও সমোচিত শিক্ষা দিয়ে দিলেন।
প্রথম প্রশ্নের শিক্ষাঃ
এখানে
মূল শিক্ষা হল তাওহীদ ও আখেরাতের উপর। নবিজী কোরআন অনুসারে যে তাওহীদের
দাওয়াত দিচ্ছিলেন আসহাবে ফাহফ রা তারই উত্তরসুরী। এখানে তাওহীদের
স্বীকৃ্তিদানকারী ঈমানদের কে এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যে, কাফেররা সীমাহীন
ক্ষমতা ও আধিপত্য অধিকারি হয়েছে মনে করে যদি ঈমানদের নিশ্বাস বন্ধ হয়ে
যাওয়ার মত জুলুম নির্যাতনও চালায় তাও তাদের বাতিল শক্তির কাছে মাথা নত করা
যাবে না।মক্কার আখিরাতে অবিশ্বাসি কাফেরদেরকে এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছে
যে,আল্লাহ তালা যে ভাবে আসহাবে কাহফকে সুদীর্ঘকাল মৃত্যু নিদ্রায় অচেতন
রাখার পরও আবার যে ভাবে জীবিত করলেন। তেমনি ভাবে তোমাদের মৃত্যুর পর
তোমাদের আবার পুর্নজীবিত করার ক্ষমতা রাখেন।
মক্কার
কাফেরদের চরম জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন, বিরোধীতা ও প্রতিবন্ধকতা দেখে
রাসুল সাঃ যেন এ জালেমদের সাথে সমঝোতায় না যায় আর নিজেদের অর্থনৈতিক ভাবে
দুর্বল মনে করে মক্কার স্বচ্ছ ও ধনী পরিবারের সরদারদের যেন মোটেও গুরুত্ব
না দেওয়া হয়।কারন তারা দুই দিনের আরাম আয়েশের জীবনে পড়ে চিরন্তন ও
চিরস্থায়ী কল্যান সন্ধান করার কথা ভুলে গেছে।
বর্তমান
প্রেক্ষাপটঃ বর্তমানে যারা রাসুলে পাক সাঃএর রেখে যাওয়া দায়িত্ত্ব
আঞ্জাম দেওয়ার জন্য ময়দানে দ্বীন প্রচারের কাজ করছে তাদের কে বিভিন্ন ভাবে
ঠাট্টা,বিদ্রূপ, গালিগালাজ, মিথ্যা প্রচারনা এমন কি চরম জুলুম, নির্যাতন,
নিপীড়ন,বিরোধীতা ও প্রতিবন্ধকতা স্বীকার হতে হচ্ছে। নিরপরাদ লোকদের জেল,
জুলুম ,রিমান্ড ও বিনা বিচারে আটক রেখে মানব জীবন এর নিশ্বাস ফেলা কঠিন করে
ফেলছে।আমরা ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে এই বাতিল শক্তির নিকট মাথা নত করব না।
কারন আমাদের চেয়েও আগের ঈমানদাররা আর কঠিন ভাবে ঈমানের পরীক্ষা দিয়েছেন।
তারা ধন ও জনবলে নিজেদেরকে যতই প্রতাপশালী মনে করুক না কেন আল্লাহর ক্ষমতার
কাছে তাদের সব কিছু মাকসার জাল।তাই তাদের এই ক্ষনস্থায়ী ক্ষমতার দাপোটের
গুরুত্ব দেও্য়া যাবে না ।নিজেদের কে গরীব, অসহায় বা সামাজিক ও অর্থনৈতিক
ভাবে দুর্বল মনে করা ঠিক হবে না। কারন আল্লাহ সর্বশক্তিমান।
দ্বিতীয় প্রশ্নের শিক্ষাঃ
খিযির
ও মুসা আঃ এর কাহিনী টা ছিল একদিকে কাফেরদের জবাব আরেক দিকে মুমিনদের চরম
অগ্নিপরীক্ষার সময়ে তাদের হৃদয়ের সান্তনার সরঞ্জাম। এখানে মুল শিক্ষা হল,
আল্লাহ সর্বজ্ঞাতা। তিনি যে উদ্দেশ্যে ও কল্যানকারীতার ভিত্তিতে এ বিশাল
সৃষ্টিজগত পরিচালনা করছেন তা আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞান ও চিন্তাশক্তির অন্তরাল।
তাই আমরা অজ্জতা ও অধৈর্য্য হয়ে প্রশ্ন করি, এমন কেন হল? এ কি হয়ে গেল?এ
তো বড় ক্ষতি হয়ে গেল?আর যদি আল্লাহ আমাদের সীমিত জ্ঞানের পর্দা সরায়ে দেন
তা হলে আমারাই বলব যা হচ্ছে সব ঠিক মতই হচ্ছে। বাহ্যিক দৃষ্টিতে কোন কিছু
তে ক্ষতি দেখা গেলেও পরক্ষনে দেখা যায় এতেই কল্যান নিহিত।
বর্তমান
প্রেক্ষাপটঃ বর্তমানে বাংলাদেশের যত ইসলামী আন্দোলনের বিরোধি প্রচারনা যতই
চলছে ততই ইসলামী আন্দোলনের ইসলামের দাওয়াত জনগনের ঘরে ঘরে পৌছে যাচ্ছে।
আর ইসলামী সমাজ কায়েমের আগে আল্লাহ আমাদের কে ভালভাবে যাছাই করে নিচ্ছেন।
তাই আমরা কোন প্রশ্ন বা দায়িত্তের অবহেলা না করে এর ভিতরেই আমাদের কল্যান
নিহিত আছে মনে করে ইসলামের কাজ চালিয়ে যাওয়া উচিত। সামুয়িক মনে হচ্ছে
আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে কিন্তু অদুর ভবিষ্যতে দেখা যাবে এতে সুদুর প্রসারী
ফলাফল নিহিত রয়েছে।
তৃতীয় প্রশ্নের শিক্ষাঃ
যুলকারনাইনের
কাহিনী থেকে মক্কার কাফের সরদারদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়ে দেওয়া হয়েছে
যে ক্ষমতার দাপট ও অহংকারের মোহে পরে তোমরা কি করছ? আর জুলকারনাইন অনেক বড়
একজন শাসক , বিজেতা ও বিশাল উপায় উপকরনের মালিক হয়েও তার প্রভুর কৃ্তজ্ঞ
বান্দা হিসাবে নিজেকে প্রভুর প্রতি অনুগত রাখতেন। দুনিরায় ধন সম্পদ মান
সম্মান যশ খ্যাতি কে কাফেররা চিরস্থায়ী মনে করে আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে। অথচ
যুলকারনাইন দুনিয়ার সব চাইতে শক্ত ও মজবুত প্রাচীর নির্মান করেও অহংকার না
করে বা প্রাচীরের উপর নির্ভর না করে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর নির্ভর
করেছেন। কারন আল্লাহ চাইলে এই প্রাচীর দিয়ে শত্রু থেকে রক্ষা করাবেন আর না
চাইলে এটা ধুলিস্যাৎ করে দিতে পারবেন ।
বর্তমান প্রেক্ষাপটঃ
ক্ষমতা আল্লাহর দেওয়া দান। আল্লাহ যে কোন ব্যক্তি বা দল কে ক্ষমতা দিতেও
পারেন আবার তা চিনিয়ে নিতেও পারেন। আজকে আমার ক্ষমতা আসে বলে আমি তার
অপব্যবহার করব তা ঠিক হবে না। কারন এর জন্য আল্লাহর কাঠ গড়ায় আমাকে দাড়াতে
হবে। যে মক্কা থেকে ক্ষমতার দাপট দেখায়ে নবীজীকে হিজরত করতে বাধ্য করেছিল
সেই মক্কা আবার আল্লাহ বিনা রক্তপাতে মুসলমানদের দখলে এনে দেয়। তাই আমরা
এখন ক্ষমতার দাপটে যে তাওহিদ ও আখেরাতের কথা ভুলে ইসলাম বিরোধি কাজ করে
যাচ্ছি তা হয়ত বেশি দিন নাও থাকতে পারে। কারন নমরুদ ফেরাউনও ক্ষমতার
অহংকারে আল্লাহর অকৃতজ্ঞ বান্দা হয়ে তাওহিদ ও আখেরাতের কথা ভুলে গিয়েছিল।
আর তাদের পরিনতি কি হয়েছিল তা আমাদের কার অজানা নয়।
আরেকটা বিশেষ শিক্ষা এখানে দেওয়া হয়েছে যে, আগামি কাল কিছু করব তা বলার আগে আল্লাহকে স্মরন করে নিয়ে ইনশাল্লাহ বলতে হবে।
এখানে
আমাদেরকে ৩ টি প্রশ্নের উত্তর এর মাধ্যমে তাওহীদ ও আখেরাতের মুলশিক্ষা
দেওয়া হয়েছে। আমরা এই সুরার থেকে যে শিক্ষা পেয়েছি তার আলোকে নিজেদের
সংশোধন করে নেওয়া ।নিজেকে আল্লাহর সামনে জবাব দিহি করতে হবে মনে রেখে
জীবনের প্রতিটি সময় অতিবাহিত করা।কঠিন ও সহজ সকল অবস্থায় আল্লাহর রহমতের
প্রত্যাশা করা।
দোয়াঃ
হে আমাদের রব !তোমার
বিশেষ রহমতের ধারায় আমাদের প্লাবিত করুন ।তুমি বড় ক্ষমাশীল ও দয়ালু ।তাই
আমাদের ক্ষমা করে দাও ।আমাদের কৃতকর্মের জন্য আমাদের পাকড়াও কর না ।আমার
এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় কোন ভুল হলে ক্ষমা করে দিও।আর যদি তুমি তোমার উপার
দয়ায় তা কবুল করে নাও তা হলে এর ছও্য়াব টুকু বাংলাদেশের কারাগারে ও
হাসপাতালে তোমার দ্বীনের মজলুম মুজাহিদের উপর রহমত হিসাবে দান করুন ।
“হে
আল্লাহ্ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুশ্চিন্তা ও দুর্ভাবনা থেকে,
অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষের
অত্যাচার থেকে।”(বুখারী)
হে
চিরঞ্জিব ও সকল কিছুর ধারক! তোমার কাছে আমি সাহায্য প্রর্থনা করছি, সুতরাং
আমার সকল অবস্থা সংশোধন করে দাও, এবং এক পলকের জন্য হলেও আমাকে আমার নিজের
উপর ছেড়ে দিও না।(নাসাঈ) ।
আল্লাহ আমাদের সকলকে শয়তানের বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে মুক্ত জীবন-যাপন করার তাওফীক দিন।
হে আল্লাহ্ তুমি অসীম ক্ষমতাময়। আমরা শয়তানের সামনে অসহায়। তাই তোমার অসীম
ক্ষমতার মাধ্যমে শয়তানের সবধরনের ষড়যন্ত্র থেকে আশ্রয় চাইছি। হে আল্লাহ
আমাদের কে মানুষের প্রথম এবং শেষ শত্রু প্রকাশ্য শত্রু শয়তান এর কুমন্ত্রনা
ও অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য ঈমানী শক্তি দান করুন।আমীন